google.com, pub-8608639771527197, DIRECT, f08c47fec0942fa0
News

সেহরির দোয়া: রোজার নিয়ত, ফজিলত ও রমজানের আমল

সেহরির দোয়া বা রোজার নিয়ত হলো রমজান মাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। পবিত্র রমজান মাস মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মুমিন বান্দাদের জন্য এক বিশেষ নেয়ামত। এই মাসে প্রতিটি ইবাদতের সওয়াব বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। রোজা পালনের জন্য সেহরি খাওয়া যেমন সুন্নত, তেমনি রোজার নিয়ত করা বা দোয়া পড়া একটি আবশ্যিক বিষয়। তবে আমাদের দেশের প্রচলিত সংস্কৃতিতে সেহরির দোয়া বলতে মূলত রোজার নিয়তকেই বোঝানো হয়ে থাকে। আজকের এই বিস্তারিত পোস্টে  আমরা সেহরির গুরুত্ব, দোয়া, নিয়ত এবং এর সংশ্লিষ্ট নানা বিধিবিধান নিয়ে আলোচনা করব।

সেহরির দোয়া ও রোজার নিয়তের গুরুত্ব

ইসলামি শরিয়তে যেকোনো ইবাদতের কবুলিয়তের জন্য নিয়ত করা আবশ্যক। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, “সমস্ত কাজের ফলাফল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।” রোজা যেহেতু একটি শারীরিক ও আধ্যাত্মিক ইবাদত, তাই মনে মনে রোজা রাখার সংকল্প করাই হলো নিয়ত। অনেকে একেই সেহরির দোয়া বলে অভিহিত করেন। যদিও সুনির্দিষ্টভাবে সেহরি খাওয়ার কোনো দোয়া হাদিসে বর্ণিত হয়নি, তবে খাওয়ার শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা এবং শেষে আল্লাহর শোকর আদায় করা প্রতিটি খাবারের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

রোজার নিয়ত করা বা মনে মনে ইচ্ছা পোষণ করা জরুরি। আপনি যখন সেহরি খেতে উঠছেন, তখন আপনার অবচেতন মনে এই ইচ্ছা থাকে যে আপনি আগামীকাল রোজা রাখবেন—এটাই মূলত নিয়ত। মুখে কোনো বিশেষ শব্দ উচ্চারণ করা বাধ্যতামূলক নয়, তবে স্বচ্ছতার জন্য অনেকে মুখে নিয়ত করেন। এই বিষয়ে আরও গভীর ও নির্ভুল তথ্য পেতে আপনি infofactbd.com ওয়েবসাইটটি নিয়মিত অনুসরণ করতে পারেন, যেখানে ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়।

সেহরির দোয়া বা রোজার আরবি নিয়ত

আমাদের দেশে প্রচলিত একটি আরবি নিয়ত মানুষ মুখে পড়ে থাকেন। যদিও হাদিসের কিতাবে সরাসরি এই শব্দগুলো পাওয়া যায় না, তবুও অর্থগত দিক থেকে এটি সঠিক হওয়ায় অনেকে এটি পড়তে পছন্দ করেন। নিচে সেই নিয়তটি অর্থসহ প্রদান করা হলো:

আরবি নিয়ত: نَوَيْتُ اَنْ اُصُوْمَ غَدًا مِّنْ شَهْرِ رَمْضَانَ الْمُبَارَكِ فَرْضًا لَكَ يَا اللهُ فَتَقَبَّلْ مِنِّى اِنَّكَ اَنْتَ السَّمِيْعُ الْعَلِيْمُ

বাংলা উচ্চারণ: নাওয়াইতু আন আছুমা গাদাম মিন শাহরি রমাদানাল মুবারাক; ফারদাল্লাকা ইয়া আল্লাহু, ফাতাকাব্বাল মিন্নি ইন্নিকা আনতাস সামিউল আলিম।

অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আগামীকাল পবিত্র রমজানের তোমার পক্ষ থেকে নির্ধারিত ফরজ রোজা রাখার ইচ্ছা পোষণ (নিয়ত) করলাম। অতএব তুমি আমার পক্ষ থেকে কবুল করো, নিশ্চয়ই তুমি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞানী।

নিয়ত কি মুখে বলা জরুরি?

ইসলামি ফিকাহবিদদের মতে, নিয়ত হলো মনের একটি সংকল্প। তাই মুখে সেহরির দোয়া বা নিয়ত উচ্চারণ করা আবশ্যক নয়। যদি কেউ মনে মনে এই ইচ্ছা পোষণ করে যে সে আগামীকাল রোজা রাখবে, তবে তার রোজা হয়ে যাবে। এমনকি যদি কেউ নিয়ত করতে ভুলে যায় কিন্তু সেহরি খাওয়ার উদ্দেশ্যে ঘুম থেকে উঠে কিছু খায়, তবে সেই সেহরি খাওয়াটাই তার নিয়ত হিসেবে গণ্য হবে। তবে নিয়ত যদি মুখে উচ্চারণ করা হয়, তবে তা মনকে আরও সুদৃঢ় করতে সহায়তা করে।

সেহরি খাওয়ার বিশেষ ফজিলত ও বরকত

সেহরি খাওয়া কেবল ক্ষুধা নিবারণের মাধ্যম নয়, বরং এটি একটি বরকতময় ইবাদত। নবী কারিম (সা.) বলেছেন, “তোমরা সেহরি খাও, কারণ সেহরিতে বরকত রয়েছে।” (বুখারি ও মুসলিম)। অন্য এক হাদিসে এসেছে যে, মুসলিমদের রোজা এবং আহলে কিতাবদের (ইহুদি ও খ্রিস্টান) রোজার মধ্যে পার্থক্য হলো সেহরি খাওয়া। অর্থাৎ তারা সেহরি খায় না, আর আমরা মহান আল্লাহর আদেশে সেহরি খাই।

সেহরি খাওয়ার মাধ্যমে রোজাদারের শরীরে শক্তি সঞ্চয় হয়, যা সারাদিন ইবাদত-বন্দেগি করতে সাহায্য করে। তাই সামান্য এক ঢোক পানি পান করে হলেও সেহরি খাওয়া উচিত। এই সময়ে দোয়া কবুল হয় এবং ফেরেশতারা সেহরি গ্রহণকারীদের জন্য মাগফিরাতের দোয়া করতে থাকেন।

সারণী ১: সেহরি ও ইফতারের গুরুত্ব ও পার্থক্য
বিষয়সেহরিইফতার
উদ্দেশ্যশারীরিক শক্তি ও সুন্নত পালনরোজা সমাপ্তি ও আল্লাহর নিয়ামত গ্রহণ
সময়কালসুবেহ সাদিকের আগেসূর্যাস্তের ঠিক পরে
মূল ইবাদতসেহরির দোয়া ও নিয়তইফতারের দোয়া ও শোকর আদায়
বিশেষত্বফেরেশতাদের দোয়া প্রাপ্তিদোয়া কবুলের শ্রেষ্ঠ সময়

সেহরিতে যে খাবারগুলো খাওয়া সুন্নত

সেহরি খাওয়ার সময় আমাদের লক্ষ্য রাখা উচিত যেন আমরা সুন্নত পদ্ধতি অনুসরণ করি। রাসুলুল্লাহ (সা.) সেহরিতে খেজুর খাওয়াকে সর্বোত্তম বলেছেন। খেজুর এমন একটি খাবার যা তাৎক্ষণিক শক্তি প্রদান করে এবং দীর্ঘক্ষণ ক্ষুধা নিবারণে সাহায্য করে। সেহরির সময় পানি পান করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যাতে সারাদিন পানিশূন্যতা তৈরি না হয়।

সুন্নাহ অনুযায়ী সেহরির তালিকায় রাখা যেতে পারে এমন কিছু খাবার:

  • খেজুর: এটি সেহরির সর্বোত্তম খাবার হিসেবে হাদিসে বর্ণিত।
  • পানি: পর্যাপ্ত পানি পান করা সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত।
  • দুধ ও ফল: এগুলো দীর্ঘক্ষণ পেটে থাকে এবং পুষ্টি যোগায়।
  • হালকা খাবার: অতিরিক্ত মসলাযুক্ত খাবার পরিহার করে সহজপাচ্য খাবার খাওয়া উত্তম।

সেহরির দোয়া ও রমজানে তাকওয়া অর্জন

রমজানের মূল উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জন করা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল; যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।” (সুরা বাকারা, আয়াত ১৮৩)। রোজা কেবল না খেয়ে থাকার নাম নয়, বরং মিথ্যা, গিবত এবং অনৈতিক কাজ থেকে নিজেকে দূরে রাখাই হলো প্রকৃত রোজা।

সেহরির দোয়া বা নিয়তের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর কাছে প্রতিশ্রুতি দেই যে, কেবল তার সন্তুষ্টির জন্যই আমরা সারাদিন পানাহার ও কামাচার থেকে বিরত থাকব। এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার মাধ্যমেই আমাদের চরিত্রের উন্নয়ন ঘটে। তাই সেহরির সময়টুকু শুধু খাবারের আয়োজনে ব্যয় না করে তওবা এবং ইস্তিগফারের মাধ্যমে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের চেষ্টা করা উচিত।

ইফতারের দোয়া ও এর ফজিলত

সেহরির দোয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ইফতারের সময় দোয়া পড়া এবং আল্লাহকে স্মরণ করা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইফতারের মুহূর্তটি হলো দোয়া কবুলের জন্য শ্রেষ্ঠ সময়। সারাদিন ক্ষুধার্ত থাকার পর যখন বান্দা সামনে খাবার নিয়ে আল্লাহর আদেশের অপেক্ষা করে, তখন আল্লাহ অত্যন্ত খুশি হন।

ইফতারের দোয়া: اَللَّهُمَّ لَكَ صُمْتُ وَ عَلَى رِزْقِكَ اَفْطَرْتُ

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা লাকা ছুমতু ওয়া আলা রিযক্বিকা আফতারতু।

অর্থ: হে আল্লাহ! আমি তোমারই জন্য রোজা রেখেছি এবং তোমারই দেওয়া রিজিকের মাধ্যমে ইফতার করছি। (আবু দাউদ)

ইফতার করার পর রাসুল (সা.) আরেকটি দোয়া পড়তেন: “জাহাবাজ জামাউ; ওয়াবতাল্লাতিল উ’রুকু; ওয়া সাবাতাল আজরু ইনশাআল্লাহ।” অর্থাৎ—পিপাসা দূর হলো, শিরা-উপশিরা সিক্ত হলো এবং ইনশাআল্লাহ সওয়াবও স্থির হলো। এই দোয়াগুলো পড়ার মাধ্যমে বান্দার মনে এক গভীর প্রশান্তি অনুভূত হয়।

ইফতারের পর শোকর আদায়

ইফতার শেষ করার পর আল্লাহর শোকর আদায় করা প্রতিটি মুমিনের দায়িত্ব। আল্লাহ আমাদের যে নেয়ামত দান করেছেন, তার শুকরিয়া না জানালে নেয়ামত কমে যায়। রমজানে এই শোকর আদায়ের গুরুত্ব বহুগুণ বেশি। সেহরির দোয়া দিয়ে শুরু করে ইফতারের দোয়া দিয়ে দিনটি শেষ করার মাঝে এক অপার্থিব তৃপ্তি লুকিয়ে থাকে।

রমজানের ফজিলত সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ হাদিস

রমজান ও রোজা নিয়ে অসংখ্য হাদিস বর্ণিত হয়েছে যা আমাদের ঈমানকে শক্তিশালী করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখবে, আল্লাহ তার পূর্বের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।” (বুখারি ও মুসলিম)। এটি আমাদের জন্য এক বিশাল সুযোগ নিজের জীবনকে পাপমুক্ত করার।

সারণী ২: রোজার শারীরিক ও আধ্যাত্মিক উপকারিতা
উপকারিতার ধরণবিবরণ
আধ্যাত্মিকতাকওয়া ও ধৈর্য বৃদ্ধি পায়।
শারীরিকপাকস্থলী বিশ্রাম পায় এবং শরীর বিষমুক্ত (ডি-টক্স) হয়।
মানসিকরাগ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
সামাজিকদরিদ্রদের দুঃখ-কষ্ট অনুধাবন করা যায়।

সেহরির সময় ও শেষ সীমানা

অনেকেই সেহরির সময় নিয়ে বিভ্রান্তিতে ভোগেন। সেহরির সময় হলো সুবেহ সাদিক পর্যন্ত। অর্থাৎ ফজরের আজানের আগ পর্যন্ত খাওয়া যায়। তবে সতর্কতামূলকভাবে আজানের ৩-৪ মিনিট আগেই খাওয়া শেষ করা উত্তম। যদি কেউ খেতে খেতে আজান শুনে ফেলে, তবে সাথে সাথে খাওয়া বন্ধ করতে হবে। ইসলাম আমাদের বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছে, আবার একেবারে অবহেলা করতেও মানা করেছে। তাই সঠিক সময়ে সেহরির দোয়া বা নিয়ত সম্পন্ন করা একজন সচেতন মুসলিমের পরিচয়।

রোজার নিয়ত সম্পর্কে কিছু সাধারণ ভুল ধারণা

আমাদের সমাজে রোজা বা সেহরির দোয়া নিয়ে কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। যেমন:

  1. অনেকে মনে করেন আরবি নিয়ত না পড়লে রোজা হবে না। এটি সম্পূর্ণ ভুল, কারণ নিয়ত হলো মনের ইচ্ছা।
  2. অনেকে সেহরি খেতে না পারলে মনে করেন রোজা রাখা যাবে না। অথচ সেহরি না খেয়েও রোজা রাখা বৈধ।
  3. অনেকে ইফতারের সময় দোয়া কবুলের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না, যা একটি বড় সুযোগ হাতছাড়া করা।

আমাদের উচিত কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক জ্ঞান অর্জন করা এবং সেই অনুযায়ী আমল করা। সঠিক নিয়ম জানতে অভিজ্ঞ আলেমদের পরামর্শ নেওয়া এবং নির্ভরযোগ্য ইসলামিক সাইট যেমন infofactbd.com থেকে তথ্য সংগ্রহ করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

সেহরির দোয়া ও প্রস্তুতি নিয়ে শেষ কথা

সেহরির দোয়া বা রোজার নিয়ত আমাদের ইবাদতের প্রাণ। রমজান মাস আসে আমাদের আত্মশুদ্ধির সুযোগ করে দিতে। সেহরি থেকে শুরু করে ইফতার পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্তই ইবাদত হিসেবে গণ্য হতে পারে যদি আমাদের নিয়ত সঠিক থাকে। সেহরির বরকত গ্রহণ করা, সুন্নত অনুযায়ী খাবার খাওয়া এবং একাগ্রচিত্তে আল্লাহর কাছে দোয়া করা—এগুলোই একজন মুমিনের প্রকৃত বৈশিষ্ট্য।

২০২৬ সালের রমজানে আমরা যেন প্রতিটি রোজা সহিহভাবে পালন করতে পারি এবং সেহরির দোয়া ও নিয়তের মাধ্যমে আমাদের সংকল্পকে দৃঢ় করতে পারি, সেই তৌফিক মহান আল্লাহ আমাদের দান করুন। রমজান হোক আমাদের পাপমুক্তির মাস এবং জান্নাত লাভের সোপান।

শেষ কথা

পরিশেষে বলা যায়, সেহরির দোয়া কেবল কিছু শব্দের সমষ্টি নয়, এটি আল্লাহর প্রতি আমাদের আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ। সঠিক সময়ে সেহরি খাওয়া, নিয়ত করা এবং সারাদিন সংযম পালনের মাধ্যমেই রোজার সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যায়। আশা করি, আজকের এই বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে আপনারা সেহরি ও রোজার নিয়মাবলি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পেয়েছেন। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে কবুল করুন। আমিন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button