এলপিজি গ্যাসের দাম ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পুনরায় সমন্বয় করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। বর্তমান সময়ে রান্নার কাজে এলপিজি গ্যাস একটি অপরিহার্য উপাদান হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এর দামের সামান্য পরিবর্তনও সাধারণ মানুষের বাজেটে বড় প্রভাব ফেলে। আপনি যদি আজকের এলপিজি গ্যাসের বাজার দর এবং বিভিন্ন ওজনের সিলিন্ডারের দাম সম্পর্কে জানতে চান, তবে এই আর্টিকেলটি আপনার জন্য। এখানে আমরা সরকারি ও বেসরকারি খাতের এলপিজি গ্যাসের সঠিক মূল্য তালিকা এবং দাম বাড়া বা কমার কারণগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছি।
এলপিজি গ্যাসের দাম ২০২৬ আজকের আপডেট
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গত ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে চলতি মাসের জন্য এলপিজি গ্যাসের নতুন দাম ঘোষণা করেছে। গত জানুয়ারি মাসের তুলনায় ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতি ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সৌদি আরামকোর প্রপেন ও বিউটেনের দাম বাড়ার কারণে দেশীয় বাজারেও এই মূল্য সমন্বয় করতে হয়েছে বলে জানিয়েছে কমিশন।
ফেব্রুয়ারি ২০২৬ মাসের জন্য ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১,৩০৬ টাকা থেকে ৫০ টাকা বাড়িয়ে ১,৩৫৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই নতুন দাম ২ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৬টা থেকে সারা দেশে কার্যকর হয়েছে।
এলপিজি গ্যাসের দাম ২০২৬ (সিলিন্ডার ভিত্তিক তালিকা)
ভোক্তাদের সুবিধার্থে বিভিন্ন ওজনের সিলিন্ডারের জন্য বিইআরসি নির্ধারিত নতুন মূল্য তালিকা নিচে দেওয়া হলো। এই দামগুলো বেসরকারি খাতের এলপিজি সিলিন্ডারের জন্য প্রযোজ্য:
বেসরকারি এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্য তালিকা (ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
| সিলিন্ডারের ওজন (কেজি) | নতুন নির্ধারিত দাম (টাকা) |
| ৫.৫ কেজি | ৬২২ টাকা |
| ১২ কেজি | ১,৩৫৬ টাকা |
| ১২.৫ কেজি | ১,৪১৩ টাকা |
| ১৫ কেজি | ১,৬৯৬ টাকা |
| ১৬ কেজি | ১,৮০৯ টাকা |
| ১৮ কেজি | ২,০৩৫ টাকা |
| ২০ কেজি | ২,২৬০ টাকা |
| ২২ কেজি | ২,৪৮৭ টাকা |
| ২৫ কেজি | ২,৮২৬ টাকা |
| ৩০ কেজি | ৩,৩৯১ টাকা |
| ৩৩ কেজি | ৩,৭৩১ টাকা |
| ৩৫ কেজি | ৩,৯৫৬ টাকা |
| ৪৫ কেজি | ৫,০৮৭ টাকা |
সরকারি এলপিজি গ্যাসের দাম ২০২৬
বেসরকারি খাতের গ্যাসের দাম বাড়লেও সরকারি পর্যায়ে সরবরাহকৃত সাড়ে ১২ কেজি (১২.৫ কেজি) সিলিন্ডারের দাম আগের মতোই অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। সরকারি এলপিজি গ্যাসের দাম বর্তমানে ৮২৫ টাকা। তবে সাধারণ বাজারে সরকারি সিলিন্ডারের সরবরাহ অত্যন্ত সীমিত হওয়ায় সাধারণ ভোক্তাদের মূলত বেসরকারি কোম্পানির ওপরই নির্ভর করতে হয়।
অটোগ্যাসের নতুন দাম ২০২৬
যানবাহনে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত এলপিজি বা অটোগ্যাসের দামও ফেব্রুয়ারি মাসে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিইআরসি’র তথ্য অনুযায়ী, ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটার অটোগ্যাসের দাম ২.৩৪ টাকা বাড়িয়ে ৬২.১৪ টাকা (মূসকসহ) নির্ধারণ করা হয়েছে। গত জানুয়ারি মাসে এই অটোগ্যাসের দাম ছিল প্রতি লিটার ৫৯.৮০ টাকা।
আরও জানতে পারেনঃ গরিলা গ্লাস প্রাইস ইন বাংলাদেশ-গেরিলা গ্লাস দাম
এলপিজি গ্যাসের দাম বাড়ার প্রধান কারণসমূহ
এলপিজি গ্যাসের দাম ২০২৬ সালে কেন ক্রমাগত ওঠানামা করছে, তা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন রয়েছে। এর পেছনে মূলত কয়েকটি শক্তিশালী কারণ কাজ করে:
১. সৌদি কন্ট্রাক্ট প্রাইস (Saudi CP)
বাংলাদেশ যেহেতু এলপিজি আমদানিনির্ভর দেশ, তাই আন্তর্জাতিক বাজারের সৌদি আরামকো কোম্পানির প্রপেন ও বিউটেনের দামের ওপর ভিত্তি করে আমাদের দেশের দাম নির্ধারিত হয়। একে বলা হয় সৌদি কন্ট্রাক্ট প্রাইস বা সিপি। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে বা কমলে এর প্রভাব এলপিজিতেও পড়ে।
২. ডলারের বিনিময় হার
আমদানি করতে হলে ডলারের প্রয়োজন হয়। যদি বাংলাদেশি টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বেড়ে যায়, তবে গ্যাস আমদানির খরচও বেড়ে যায়। ফলে স্থানীয় বাজারে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পায়।
৩. জাহাজ ভাড়া ও পরিবহন ব্যয়
এলপিজি পরিবহন করার জন্য বড় বড় ট্যাংকার ব্যবহৃত হয়। আন্তর্জাতিক নৌ-পথে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে জাহাজ ভাড়াও বৃদ্ধি পায়, যা পরোক্ষভাবে সিলিন্ডারের মূল্যের ওপর প্রভাব ফেলে।
ভোক্তা পর্যায়ে এলপিজি গ্যাসের বাজার পরিস্থিতি
বিইআরসি দাম নির্ধারণ করে দিলেও অনেক সময় খুচরা বাজারে বা পাড়া-মহল্লার দোকানে এই দামে গ্যাস পাওয়া যায় না। বিক্রেতারা প্রায়ই পরিবহন খরচ বা সংকটের দোহাই দিয়ে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ১০০ থেকে ২০০ টাকা বেশি নিয়ে থাকেন। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার বর্তমানে কাজ করছে।
ভালো খবর: ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এলপিজি আমদানিতে কর অব্যাহতির প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর ফলে স্থানীয় উৎপাদন ও ব্যবসায়িক পর্যায়ে বিদ্যমান ৭.৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ২ শতাংশ আগাম করের বোঝা কমবে। আশা করা যাচ্ছে, আগামী মার্চ মাস থেকেই খুচরা বাজারে এলপিজি গ্যাসের দাম ২০২৬ কিছুটা কমে আসবে।
এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহারের কিছু জরুরি টিপস
গ্যাস ব্যবহারের সময় আমাদের অবশ্যই নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। নিচে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেওয়া হলো:
- সিলিন্ডার চেক করুন: গ্যাস কেনার সময় সিলিন্ডারের গায়ে থাকা মেয়াদের তারিখ অবশ্যই দেখে নেবেন।
- সঠিক রেগুলেটর: সবসময় অনুমোদিত এবং ভালো মানের রেগুলেটর ও পাইপ ব্যবহার করুন।
- বন্ধ রাখুন: রান্না শেষ হওয়ার পর চুলা এবং সিলিন্ডারের রেগুলেটর—উভয়ই বন্ধ করার অভ্যাস করুন।
- বাতাস চলাচল: রান্নাঘর সবসময় খোলামেলা রাখুন যাতে গ্যাস লিক হলে তা সহজেই বেরিয়ে যেতে পারে।
- গন্ধ পেলে সাবধান: যদি গ্যাসের কটু গন্ধ পান, তবে সাথে সাথে জানলা-কপাট খুলে দিন এবং ইলেকট্রিক সুইচ স্পর্শ করবেন না।
প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ১২ কেজি এলপিজি গ্যাসের দাম কত?
ফেব্রুয়ারি ২০২৬ মাসের জন্য ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১,৩৫৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারি এলপিজি গ্যাসের দাম কত?
সরকারি এলপিজি গ্যাসের সাড়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৮২৫ টাকা, যা বর্তমানে অপরিবর্তিত রয়েছে।
অটোগ্যাসের বর্তমান প্রতি লিটার দাম কত?
বর্তমানে অটোগ্যাসের দাম প্রতি লিটার ৬২.১৪ টাকা।
খুচরা বাজারে কেন নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি নেওয়া হয়?
পরিবহন খরচ এবং ডিলার বা খুচরা বিক্রেতাদের মুনাফার পার্থক্যের কারণে অনেক সময় মূল্যের তারতম্য ঘটে। তবে অতিরিক্ত দাম নেওয়া আইনত দণ্ডনীয়।
এলপিজি গ্যাসের দাম কি সামনে কমবে?
হ্যাঁ, সরকার এলপিজি আমদানিতে কিছু ভ্যাট ও কর কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার প্রভাব আগামী মাসের দাম নির্ধারণে দেখা যেতে পারে।
শেষ কথা
পরিশেষে বলা যায়, এলপিজি গ্যাসের দাম ২০২৬ আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতির ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। যদিও ফেব্রুয়ারি মাসে দাম কিছুটা বেড়েছে, তবে সরকারের নতুন কর ছাড়ের সিদ্ধান্তের ফলে আগামী দিনগুলোতে দাম কমার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। রান্নার খরচ সাশ্রয় করতে এবং নিরাপদ থাকতে সঠিক দামে সিলিন্ডার ক্রয় করা জরুরি। সবসময় সরকারি নির্ধারিত মূল্য তালিকা দেখে কেনাকাটা করুন এবং বাড়তি দাম চাইলে অভিযোগ কেন্দ্রে যোগাযোগ করুন। নিরাপদ জ্বালানি ব্যবহার করুন এবং সুন্দর জীবন যাপন করুন।

